বিতর্কিত কর্মকর্তাকে টাকশালের এমডি করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: টাকা ছাপানোর স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান দ্যা সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড। যা টাকশাল নামে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হলো বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার টাকশালের এমডি হিসেবে বিতর্কিত এক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয় এ প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এমন তথ্য জানিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র।

দ্যা সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড ঢাকার বাইরে গাজীপুরে অবস্থিত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহি পরিচালক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। বর্তমান এমডির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এমডি পদে নিয়োগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু এক বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠায় অর্থমন্ত্রণালয়ে। বিতর্কিত সেই কর্মকর্তা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক বিষ্ণুপদ সাহা।

সূত্র জানিয়েছে, বিতর্ক থাকায় সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়। টাকশালের এমডি হিসেবে একাধিক কর্মকর্তার নামের প্রস্তাবও চেয়েছে মন্ত্রণালয়।

কে এই বিতর্কিত কর্মকর্তা বিষ্ণুপদ সাহা:

বিষ্ণুপদ সাহা ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ব্যাংক পরিদর্শন, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মানিটারি পলিসি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ বিভিন্ন শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ২০১০ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পদোন্নতি পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালের জুলাই মাসে চার জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে বিষ্ণুপদ সাহাকে পদোন্নতি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক করেন রিজার্ভ চুরির ঘটনায় পদত্যাগ করা সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তাকে বদলী করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া অফিসে। এখন তিনি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া অফিসে।

জানা গেছে, আগে থেকেই বিষ্ণুপদ সাহা বিতর্কিত ছিলেন। নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ ছিল এ বিতর্কিত কর্মকর্তার নামে। তিনি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকে যুগ্ম-পরিচালক ছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো (বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন) থেকে একটি চিঠির রেফারেন্স আসে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ওই চিঠিতে বিষ্ণুপদ সাহার নামে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ আসে। বিষ্ণুপদ তখন ব্যাংকগুলোর তদারকিতে নিয়োজিত ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-১ (ডিবিআই-১ নামে অভিহিত) এ যুগ্ম-পরিচালন ছিলেন। এ বিভাগ থেকে ব্যাংকগুলোতে নানা অনিয়ম ধরতে পরিদর্শনে যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বিষ্ণুর বিরুদ্ধে এমনই একটি ব্যাংকে পরিদর্শনে গিয়ে উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ ওঠে। যখন এ অভিযোগ আসে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন মুহাম্মদ এ (রুমি) আলী। দুর্নীতি দমন ব্যুরোর এ চিঠির প্রেক্ষিতে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলী করার নির্দেশ দেন রুমী আলী। তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এমনও নির্দেশ দেন, যে বিভাগে মধু নেই ওই বিভাগে তাকে বদলী করতে। রুমী আলীর নির্দেশে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানিটারি পলিসি বিভাগে বদলী করা হয়। পরবর্তীতে ডিজিএম করে ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়।

ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট বা ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগেই ডিজিএম থেকে জিএম পদে পদোন্নতি নেন তিনি। রেমিটেন্স ও বিনিয়োগ মেলা আয়োজন তহবিল নাম দিয়ে দুই দেশে যাওয়ার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বুদ্ধিও দেন তিনি। তার পরিকল্পনার আলোকে কর্মকর্তাদের ভ্রমণ খরচ বাবদ ১৬ টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে লন্ডন ও নিউইয়র্কে যাওয়ার জন্য ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জিএম বিষ্ণুপদ সাহাও বিদেশে গিয়েছিলেন।১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতিটির কাছ থেকে ৪ লাখ করে টাকা নেওয়া হয়। সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করে।