পানামা পেপারে মার্কিনীদের নাম নেই কেন?

আয়াত আওলাকি, বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ, বাশার আল আসাদ, ডেভিড ক্যামেরন, সিগমুন্ডু ডেভিডগুনলাগুসন, মরিসিও মাকরি, লিওনেল মেসি, শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নায়হান, মারিয়ানা জেলেস্কি, পেত্রো পোরশেঙ্কো এবং ভ্লাদিমির পুতিন। বিগত কয়েকদিন ধরে চলা অর্থ পাচার কেলেঙ্গারি ফাঁস হয়ে যাবার ঘটনায় উপরের নামগুলো মোটামুটি সবারই পরিচিত। উপরোক্ত মানুষগুলোর অধিকাংশই কোনো না কোনো দেশের প্রধান। কিন্তু পামানা পেপার ফাঁস হওয়ার পর থেকে এরা সবাই রাষ্ট্রপ্রধানের পাশাপাশি অর্থ পাচারকারীও বটে। কিন্তু এই নামগুলোর মধ্যে অন্তত একজনের নাম আছে, যেটা দৃশ্যত একটু অদ্ভুত ঠেকছে।

নামগুলো থেকে যদি আপনি জেলোস্কির নামটা দেখেন তাহলেই অদ্ভুত বিষয়টির কাছাকাছি যেতে পারবেন। গত তিনদিন আগে পানামাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফোনসেকোর আভ্যন্তরীন পৌনে তিন টেরাবাইট নথি ফাঁস হয়ে যায়। জার্মানি একটি স্থানীয় পত্রিকায় একটি অপরিচিত সূত্র থেকে এই বিপুল পরিমান নথি আসে এবং এরপর থেকেই ফাঁস হয়ে যাওয়া তথ্য প্রকাশিত হতে শুরু করে। পত্রিকাটি নিউইয়র্কভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনমূলক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস’র(আইসিআইজে) সঙ্গে নথি শেয়ার করে। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ফাঁস হয়ে যাওয়া নথিগুলোতে অর্থ পাচারের অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে জেলোস্কি ছাড়া আর কোনো মার্কিনীর নাম নেই।

আইসিআইজে সর্বপ্রথম অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করতে শুরু করে। এই প্রতিষ্ঠানটিই সর্বপ্রথম প্রকাশ করে যে, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পুরোধা ব্যক্তি থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই বর্হিদেশে বাণিজ্যের নামে কর ফাঁকি দিয়ে অর্থ পাচার করেছেন বিভিন্ন সময়ে। প্রতিষ্ঠানটি আরও উল্লেখ করে যে, মোসাক ফোনসেকা কৌশলে বর্হিদেশে শেল কোম্পানির অন্তরালে এই অর্থ পাচারের কাজ করতো। বিবিসি’র রিপোর্ট অনুসারে, ৩৯ বছর বয়সী বিনিয়োগ উপদেষ্টা এবং ‘লিভ ইট, লাভ ইট, আর্ন ইট: অ্যা উইম্যানস গাইড টু ফাইনান্সিয়াল প্রিডম’ শীর্ষক বইয়ের লেখক জেলোস্কিও সঙ্গে মোসাক ফোনসেকার যোগাযোগ ছিল। অর্থ পাচারকারী প্রতিষ্ঠানটি জেলোস্কির হয়ে ১ দশটিক ৮ মিলিয়ন ডলার বর্হিদেশে পরিবহন খাতে খাটায়। এমনকি এই কাজে প্রতিষ্ঠানটি যে ব্যাংককে ব্যবহার করে, সেই ব্যাংকে পর্যন্ত জেলোস্কির নাম উল্লেখ করা হয়নি।

বিবিসি’র প্রতিবেদন সূত্রে দেখা যায়, মোসাক ফোনসেকার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সেসব ব্যক্তিদের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন করে যারা অতটা পরিচিত নয় এবং যাদের অর্থের পরিমান অত বেশি নয়। যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক হিসাবে বর্হিবিশ্বে বাণিজ্য কোনো অবৈধ বিষয় নয় এবং জেলোস্কির মতো আরও অনেকেই আছেন যারা নাম লুকিয়ে বর্হিদেশে ব্যবসা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন আয়কর বিভাগ জেলোস্কির এই ব্যবসার খবর জানতো না তা হতে পারে না। বড় বড় রাঘব বোয়ালদের মাঝে জেলোস্কি খুবই চুনোপুটি একজন বিনিয়োগকারী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অন্যান্য মার্কিনীদের নাম নেই কেন নথিতে?

প্রথমত একটা ভাবনা আসতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িরা এতটাই নিয়মতান্ত্রিক যে তারা এমন কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িত হয় না। কিন্তু এমন ভাবনা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বর্হিদেশের বাণিজ্যের উপর বেশ ভালোভাবেই নির্ভর করে এটা পানির মতো পরিস্কার। ইউনিয়ন ব্যাংক অব সুইজারল্যান্ডের কর ফাঁকি কেলেঙ্কারির সময় দেখা যায়, শুধুমাত্র ওই একটি ব্যাংকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় বিশ হাজার অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তহবিল শিল্পগুলোতে এরকম দৃশ্য সচরাচর দেখা যায়, যেখানে আভ্যন্তরীন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কর থেকে বাঁচার জন্য গ্রান্ড ক্যানিয়ন বা ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া আইল্যান্ডের মতো স্থানে বিনিয়োগ করে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্লুমবার্গ ম্যগাজিনের জেসি ড্রাকার তার রিপোর্টে বলেন, আমেরিকাকে ধন্যবাদ এই জন্য যে, তার কর সংক্রান্ত আইনের কারণে ব্যবসায়িরা বর্হিদেশে তহবিল স্থানান্তর করতে পারে। অনেক অপরিচিত খাত থেকে প্রতিদিনই বিপুল পরিমান অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে এবং বের হচ্ছে। আর এই অবৈধ প্রক্রিয়াটিকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে একঝাক মার্কিন আইনজীবি এবং অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা। সুতরাং মোসাক ফোনসেকার ফাঁসকৃত নামগুলোতে মার্কিনীদের নাম না থাকার অন্য কারণের মধ্যে এটাও হতে পারে যে, সাংবাদিকেরা যারা এখনও বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন তারা মার্কিনীদের এড়িয়ে যেতে চাইছেন। গত সোমবার ফিউশনে পত্রিকা জানায়, ‘আইসিআইজে মাত্র ২১১ জনের নাম বের করতে পেরেছে যাদের আওতাধীন কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ঠিকানায় নিবন্ধিত। এই ২১১জন সত্যিই মার্কিন নাগরিক কিনা তাও জানা যায়নি। পাশাপাশি এখন পর্যন্ত যে নামগুলো বের হচ্ছে তা সবই গত বছর এবং চলতি বছরের লেনদেনের ভিত্তিতে বের করা হচ্ছে। এখনও ১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ফাইল খুঁজে দেখা বাকী।’

আইসিআইজে’র সঙ্গে কাজ করছে ম্যাকক্লাথি নামের অপর একটি সংবাদ সংস্থা। এই সংস্থাটি এমন অনেক মার্কিন নাগরিকের নাম বের করেছে যাদের নামে বর্হিদেশে কোম্পানি রয়েছে। এই নামগুলোর মধ্যে কোনো রাজনীতিবিদ বা সুপরিচিত কোনো মার্কিনী নেই। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা সাবেক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, যারা কোস্টারিকা এবং পানামার রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন মার্কিনীর মধ্যে আছে রবার্ট মিরাকেল, বেঞ্জামিন ওয়ে, ইগর অলিনেকফ, জন মাইকেল অন্যতম।

ব্যক্তি মার্কিনীদের কথা না হয় বাদ দেয়া যায়। কিন্তু মার্কিন ব্যাংক, অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা, আইনি প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোর নাম গেল কোথায়? আইসিআইজে’র মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬১৭ টি প্রতিষ্ঠান বেনামে বর্হিদেশে বিভিন্ন সংস্থার মালিক হয়ে বসে আছেন। বলা হচ্ছে, মোসাক ফোনসেকা কয়েক বছরের চেষ্টায় এই মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন নাম এবং কোম্পানি, ফাউন্ডেশন এবং ট্রাস্ট তৈরি করে, যাতে অনুসন্ধানে সহজে বের না করা যায় এর আসল মালিকের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসে একটা সময় মোসাক ফোনসেকার অফিসও ছিল। লাস ভেগাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি তাদের শাখা বন্ধ করে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে কোনো শেল কোম্পানির শাখাও তারা খোলেনি। অথচ হংকং, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যে তারা শেল কোম্পানি খুলে কোম্পানি নিবন্ধন করতে শুরু করে।