মরোক্কান কবি ফাতিহা মর্চিড-এর কবিতা

ফাতিহা মর্চিডের জন্ম- ১৯৫৮ সালের ১৪ মার্চ। মরোক্কোতে। তিনি ১৯৮৫ সালে মেডিসিনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯০ সালে তিনি pediatery since-এ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডিগ্রি অর্জন করেন। মরোক্কোর আর দশজন কবির মতো ফাতিহা মর্চিড সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে লিখতে শুরু করেন নি। ফাতিহা বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবেই কবিতা লেখা শুরু করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কবিতায় ব্যাকরণের প্রয়োগ নেই। বরং তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে ফর্মহীন এবং নিরীক্ষাপ্রবণ। তাঁর কবিতা পাঠের পর পাঠকের মনে ধারণা জন্মানো স্বাভাবিক যে- মরোক্কোর মহিলা কবিদের কবিতা উন্নতির শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি হলো আয়নার উল্টো পিঠ। বরং এটি নতুন ধারণা তৈরি করেছে। তবে এটি প্রতিদিনের সাধারণ জীবন থেকে সত্যিকার অর্থেই আলাদা ভ্রমণ। কিন্তু খুব আস্তে নিজেকে খুঁজে পাওয়া- যে আমার পেছনের পৃথিবী একটি পৃথিবী শুরু হচ্ছে আমার বাড়ি থেকে এবং ক্রমাগত বেড়ে চলেছে তথাকথিত বিশ্বায়নের দিকে। সত্যিকার অর্থে সবকিছুই লুকানো এবং গোপন ব্যাপার একসময় আলোতে আসে। যেমন বলেছিলেন- হানা এ্যারেন্ড। এই পৃথিবীর বাইরে কিছুই নয়- তাই পৃথিবীর বাইরের কেউ নন মরোক্কোর মহিলারা।
মর্চিডে কবিতা মানেই জীবনের জটিল গোলকধাঁধার ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। যেখানে মরোক্কোর মহিলারা প্রতিনিয়ত তাদের সামর্থ দিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে রূঢ়, অবন্ধুত্বসুলভ বাস্তবতার মধ্যে। এ প্রেক্ষিতে মর্চিডের কবিতা- এর জরুরী অবস্থা- তার কবিতার বক্তাকে প্রকৃত অর্থে কোন সময়ই দেয় না মোটের ওপর পূর্বে দখল করা যে সাধারণ মত।

মরোক্কোর নারীদের যে ভাবমূর্তি ফাতিহা মর্চিডের কবিতায় ফুটে ওঠে তাতে দেখা যায়, তারা এমন এক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অংকিত হয়। এই মুহূর্তগুলো শুধু বাস্তবতার প্রতিচিত্র তৈরি করে না বরং রূপান্তর করে এক ভিন্ন আবহের। যা লেখকের অনবদ্য এক সৃষ্টি। এইখানে আমরা দেখি একজন সাধারন নারী তার অবস্থান থেকে তারা বা তাদের জীবন শুরু করে কিন্তু পরবর্তীতে নিজেদের আবিষ্কার করে বিশ্বের বাইরের কোন স্থানে। বিশ্ব তার ঘরের দুয়ারে এবং ক্রমেই প্রসারিত হয় এক গৃহহীন আবহে। যা হানা আবেন্দ এইভাবে বর্ণনা করেছেন- সব কিছু যেন অবশ্যই গোপনীয় এবং লুকায়িত থাকে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তা ধরা দেয় জীবনের রৌদ্ররে। মরোক্কোর নারীরা ছাড়া পৃথিবীর কোথাও এমন দেখা যায় না, যেখানে সূর্যাস্তে তাদের দিন শুরু হয়। তীব্র গণআন্দোলনের মতোই নারীদের এই বিপ্লব প্রতিদিনের দুর্বলতাই ঢেকে যায় এবং নিজের মধ্যে তৈরি করে এক সংশয়বাদের। চিকিৎসা পেশার বাইরে ফাতিহা মর্চিড একজন উপস্থাপিকা। তিনি মরক্কোর টিভি চ্যানেল টুএমটিভি-এর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাকারী এবং উপস্থাপক। মর্চিডের কবিতাগুলো ইংরেজি করেছেন- নরডডিন জুতনি।

শূন্যতা

একটি শূন্যতা
চিরতরে খুঁড়ছে
কেউ বন্ধ করছে না
কেউ না
এটা ধুঁকছে
কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে
চলো
চোখের এক ফোঁটা জল ফেলে দেখি।

দোলা

পছন্দের দোলাতে
ভয় আমাকে সজোরে নিক্ষেপ করছে
একটি আন্তরিক ‘না’-এর মধ্যে
‘হঠাৎ’ বেড়ে ওঠার প্রার্থনার জন্য
বিদ্রোহের অটলতায়
‘না’, ‘একহাজার বার না’
তারপর ‘চিরকাল’,‘ হঠাৎ’
.. . এবং ‘কেন না’

আমি দৌড়ে গেলাম গিলোটিনের সিদ্ধান্ত থেকে
সম্ভবত স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে
যখন.. .
যখন.. .

ইচ্ছাশক্তি

আমার প্রিয় ছোট্ট মেয়ে তোমাকে
স্রোতের ঝিরঝিরি শব্দের ভেতরে
আমি নিঃশ্চুপ
উচ্চস্বরে হেসে উঠছে দুঃখ
আমি ডুবে গিয়েছি
গন্ধের উচ্ছাসে
আমি কবর দিয়েছি
যখন আমার যৌবন উদ্দেশ্যহীনভাবে চলে গেল

তোমার প্রতি

সকল পথে
আমি হাঁটবো না।

সকল তরঙ্গে…
আমি বিবাদে জড়াবো না
ভয়ের সঙ্গে, ও আমার প্রিয়
নাবিক কি শত্রু হয়

তোমার প্রতি
সকল খাদ্যে
আমার হাত থামিয়ে রাখে
বন্ধন থেকে…

অনুপস্থিতি

অনুপস্থিতি পাগলের মতো এমন বলো না
তোমার চোখ বন্ধ করো
যেখানেই তুমি
যখন তুমি আমাকে খুঁজে পাবে..
সাগরের সাথে মিশিয়ে দাও
বিষ্ময়ের সাথে
স্রোতে এবং ভাটার টানে
কখনও অনুপস্থিত নও।

হতাশা

সূর্য ডুবে গেলে
তার দিন শুরু হয়
এমন কোন জরুরি বিষয় নয়
সে কে
যে তার ঘোড়ায় চড়তে পারে।

সে এখন মরতেও প্রস্তুত।
আমার ভাগ্যরেখার জন্য
রাতের দুঃস্বপ্ন শেষে
তুমি আমার কাছে আসো
বদলে নিতে
তোমার বিছানা…
আমার ভাগ্যরেখার জন্য

আমি চলছি আমার আটকে যাওয়া ঝুলে থাকায়
গাঢ়-নীল মশারির মতো
ছড়িয়ে পড়ি বাইরে বিষণ্ণ অপেক্ষার মতো
সুফিবাদের গালিচার মতো
যেন একটি যাযাবর ভেজাপানীয়
বসে আছে বাদশা সলোমনের অধীনে, কাছে আত্মসমর্পণে…
পরিশ্রান্ত শ্রমিকের মতো তোমার পায়ের পাতা চুম্বন করছে
এবং তোমার কপালের পাশে মেঘ
ঘুমিয়ে যাবার সৌন্দর্যের
গল্প বলে যাচ্ছে
তুমি আশা করছো
আমার হাতের তালুতে চিরদিনের জন্য শুয়ে থাকতে।

ঈর্ষা

আমি ঈর্ষান্বিত
আমার বিকেল থেকে সে আমাকে বঞ্চিত করেছে
তোমার প্রলোভনে…
খবরের সাথে,
গল্প,
এবং গোপনীয়তা…

এটা তোমার কাছে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার গোপনীয়তার থেকে
সে ছিল শেহেরজাদী
রাতের আঁধারে অপহরণ করা আমার শাহরিয়ার

আমি এ জন্য ঈর্ষান্বিত
আমার বালিশের ভেতরে সে অপেক্ষা করছে মিথ্যার মধ্যে
গিলে ফেলছে আমার মেঘের- স্রোতের মধ্যে
বৃষ্টির পরে পৃথিবীর গন্ধের ভেতরে
ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সব,
চিঠিসহ মুছে যাচ্ছে
আমার নিজের আঙুলের ছাপ

উহ! আমি কি ছিলাম
খুব গভীর কালিসহ
এই সংবাদপত্রের ভেতর।

জেগে উঠছে

সর্বনাশের শেষ থেকে আমি জেগে উঠছি
আমার গর্ব আঁকড়ে ধরে উঠছি
এবং পৌঁছে গেছি উপরের স্তরে…
কষ্টের  চরম অবস্থা
স্মৃতি থেকে আমি নির্মাণ করেছি এক নগরদুর্গ
… এবং একঘেয়ে সুরের গান থেকে।
উপর থেকে আমি খুলে দিয়েছি আমার প্রত্যাশার পাক
আমার পর্নজন্মের/পুর্নগ্রহণের আগেই…
আমার অনুভূতি।

জলযাত্রায়

এখানে আমি এবং সমুদ্র
তোমার স্নান
একটি ফোন কলের মদ্যে
… পৌঁছে দিল আমাকে
একটি পালতোলা
নৌকার পেছনে,
জ্যোতিবিদ্যা ছাড়াই
এবং তোমার চোখের সমান্তরালে…

বিষ্ময়

তার অজ্ঞাতসারে সে নিয়েছিল
একটি সুখী ভাগ্য
আলোকিত করছে তার একাকীত্বের অন্ধকার
তড়িতাহত হচ্ছে তার শ্বাস
… এবং নিভে যাচ্ছে
যেন বৈদ্যুতিক বাতি
একটি উৎসবমুখর রাতে।

সাদা ব্লাউজ

আমি লুকিয়ে রেখেছি আমার ব্যথা
এবং আমার ভেচিং কাটা হাসি
আমি দ্রুতি আমার দিনলিপির মধ্যে চালান করে দেই
আমার ঠোঁটে ব্যবহার করি রুজ
গাঢ়-নীল সুর্মা আমার চোখের পাশে
এবং আমার সাদা পোশাক।

আমি একটি ডেস্কের পেছনে বসে
শুনে যাচ্ছি অন্যের বেদনার কথা।

আমার বেদনার কথায়
কার কি বা আসে যায়!