অদৃশ্য : সানাউল্লাহ সাগর

প্লিজ শব্দ করো না…
তোমাকে নির্বাক থাকলেই বেশি ভালো লাগে। হয়তো যাকে ভালো লাগে তার সব কিছুই ভালো লাগে। তোমাকে লেখার কোন দরকার ছিল না। তুমি নাকি দুই ক্লাসও পড়ো নি। বানান করেও পড়তে পারো না। তার পরও তোমাকেই খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। জানি না শেষ পর্যন্ত যা লিখতে চাইছি তা লেখা হবে কিনা। তুমি না পড়তে পারলেও লিখতে যে পেড়েছি এই তৃপ্তিতো কাজ করবে! সকল অতৃপ্তির মধ্যে একটা তৃপ্তি নিয়ে তো চলে যেতে পারবো। জানি তুমি যে কাজ করো তা বলতে তোমার লজ্জা লাগে না। গতর বেচে বাঁচো, খাও। তোমার কাছে শুনেছি তোমার মাও নাকি এই কাজ করতো। তোমার ১১ বছর বয়সে এই পেশায় অভিষেক হয়েছিল। আমাদের পাড়ার মেয়েরা ১১ বছর বয়সে ইস্কুলে যায়। বৌচি খেলে, ছি কুত-কুত খেলে। আর তোমার যে খেলায় হাতেখড়ি তা শিখতে ওদের আরো অনেক সময় লেগে যায়।

এই শোন… তোমার না একটা বাচ্চা নেওয়ার কথা ছিল। কি হলো! আমি তো জানি না- কতো দিন দেখা হয় না তোমার সাথে- কথা হয় না। কিভাবে দেখা হবে বলো! আমি তো বাসা থেকে বের হতে পারি না। ওরা আমাকে বাসা থেকে বের হতে দেয় না। মা কেবল মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। আচ্ছা এখনতো হরদম সবাই মোবাইল ব্যবহার করছে। তুমিও নিশ্চয়ই মোবাইল ব্যবহার কর। আমার একটা মোবাইল থাকলে ভালো হতো। কিন্তু কি করবো বলো আমার নাকি মাথায় সমস্যা। আমাকে কে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেবে! আমি তো পাগল!

আজ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। ইচ্ছে করছে পটুয়াখালী গিয়ে তোমার গলির মুখে দাঁড়িয়ে একসাথে চা খেতে। তোমার এক রুমের বাসায় বসে গল্প করতে আর টিভি দেখতে। আর…আর… সত্যি বলছি ওসব কিচ্ছু না। শুধু চুমু খেতে। আচ্ছা তোমার নামটা কে দিয়েছিলো। তুমি তো বললে তোমাদের আসল কোন নাম হয় না এক একজন একেক নামে ডাকে। নাম থাকলেও ভুলে যেতে হয়। জয়িতা নামের সাথে তোমার কোন মিল নেই। জানি না কি চিন্তা করে তোমাকে এই নাম দিয়েছিল। আমি তোমাকে অল্পনা নাম দিয়েছিলাম। আমার হৃদয় তোমার গুছানো আল্পনা যে সব সময় খেলা করে। তুমি আমাকে রফিক না বলে রাফি বলতে। তোমকে আমি কখনও স্বপ্ন দেখাইনি। তুমিও চাওনি কোন মেকি স্বপ্নে ভাসতে। সমাজ আর বাস্তবতা তোমার থেকে আর কে জানে বলো! তোমার মায়ের এ পেশায় আসার গল্প শুনে আমার মতো কাঠখোট্টা মানুষও কেঁদেছিল।

যাক সে কথা তুমি কতোটা সুখি আমি জানি না। আমারতো বারবার হিসেব ভুল হওয়ায় ভুল জীবনটাকে উড়িয়ে দিচ্ছি হাওয়ায়। তোমার জীবনের কি হিসেব মিলেছে! তুমিতো বেস হাসছো খেলছো জীবনের সাথে। আমাকে স্বার্থপর বলতে পারো আমি তোমকে ছেড়ে স্বার্থপরের মতো পালাচ্ছি। বেঁচে থেকেই কি হবে বলো। তোমাকে আমি কি দিতে পারি! কি দিতে পারবো!

আল্পনা শুনছো তো ! আরো কাছে আসো। তোমার একটা বাচ্চা নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। আমিও চাইছিলাম সমাজ আর পৃথিবীর আড়ালে তোমাকে একটা বাচ্চা দিতে। কিন্তু তা আর হলো না- আর কোন দিনও হবে না। তবে আমার পছন্দনীয় একটা নাম ছিল বাচ্চার জন্য ‘স্বাতী’। ভেবো না তোমার এ ইচ্ছা হয়তো পূরণ হবে। তোমার বয়স কেবল ২১ হলো। সামনে হয়তো আরো কোন রাফি অপেক্ষা করছে…

ভালোবাসার মানুষের কাছে লেখা অসম্পূর্ণ এই চিঠিটা  রফিক ভাই আত্মহত্যা করার পর তার টেবিলে পেয়েছিলাম।

আজ সকালে পটুয়াখালীতে এসেছি। খুব মনে পড়ছে রফিক ভাইকে। ৭ বছর আগের কথা- আমি সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার দিকে বাড়ীতে এসে বাসার মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলাম বাসাটা এমন অন্ধকার কেনো! বাসায় খালাম্মা নেই তা জানি। কিন্তু খালুতো ছিল। আর রফিক ভাইতো সবসময়ই থাকে। ভিতরে ঢুকে দেখলাম- নাহ দরজাতো খোলা- তো অন্ধকার কেনো! নিশ্চয়ই বিদুৎ নেই। তাওতো জেনাটারের ব্যবস্থা আছে। রফিক ভাইকে ডাকতে ডাকতে তার রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম, তার রুমও অন্ধকার। রুমের মধ্যে ঢুকে বাতি জ্বালিয়ে যা দেখলাম তা মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও ভুলব না। ফ্যানের সাথে ঝুলছেন রফিক ভাই। আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। চিৎকার করতে গিয়েও মুখ থেকে কোন শব্দ বের হলো না। টেবিলে দেখলাম সদ্য লেখা একটা চিরকুট।
খালুর চাকুরি সূত্রে তখন রফিক ভাইয়েরা জেলা শহর ভোলায় থাকতো। দুবছর এর আগে ছিল বরিশাল। তাদের পৈত্তিক নিবাস বরিশালের গৌরনদীতে। আমার গ্রামের বাড়ি ভোলার মনপুরায়। ভোলা সরকারি কলেজে ইন্টারমেডিটে পড়ার সুবাদে খালার বাসায় থাকতাম। রফিক ভাই তাদের একমাত্র সন্তান। রফিক ভাই ভালো ছাত্র ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করেছিলেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। মাস্টার্স করা হয়নি। রফিক ভাই জেনি নামে একটি মেয়েকে ভালোবাসতো। জেনির বাবাও ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী। থাকতেন পাশাপাশি সরকারি কেয়ার্টারে। সেই সূত্রেই পরিচয় …মন দেয়া নেয়া। এটা বাসার সবাই জানতো। বিয়ের সময়টাও প্রায় ঠিক ছিল । রফিক ভাইয়ের মাস্টার্স হয়ে গেলেই বিয়ে হবে এমনটা প্রায় সিদ্ধান্ত নেওয়াই ছিল। জেনি আপুকে আমিও চিনতাম। বরিশাল বি এম কলেজে পড়ত। সেই জেনি আপুকে একদিন পাওয়া গেল শহরের পাশে একটি অনাবাদী ক্ষেতে প্রাণহীন অবস্থায়। টিজাররা কলেজে যাওয়ার পথে কিডনাপ করে তিনদিন পর ধর্ষন করে লাশ ফেলে রেখেছিল। এরপর থেকে রফিক ভাই অস্বাভিক আচরন করা শুরু করলো। পড়াটা আর হলো না। খালা-খালু মিলে একমাত্র সন্তানকে চিকিৎসায় কোন ত্রুটি করেননি। দু/তিন মাস ঠিক থাকে আবার এলামেলো হয়ে যায়।

শেষ তিন মাস ধরে রফিক ভাই ভালোই আচরন করছিল। খালু গিয়েছিল গ্রামের বাড়ি কি এক কাজের জন্য। খালু সন্ধ্যায় একটু চা খেতে বেড়িয়েছিল গলির মুখে। হয়তো একটু দেরীই হয়েছিল…আমিও ফিরেছিলাম প্রতিদিনের চেয়ে একটু দেরী করে। আমাদের সবকিছু বুঝতে মনে হয় অনেক সময়-ই একটু দেরী হয়ে যায়। রফিক ভাই নিজেকে শূন্যে ভাসিয়ে দেওয়ায় যে মগ্নছিল। তা আমরা বুঝলাম কিন্তু ততক্ষণে চিরতরে নাই হয়ে গেলেন রফিক ভাই।

আমি জীবনে প্রথম পটুয়াখালীতে এসেছি। বৃহত্তর বরিশালের একটি জেলা হওয়ার পরও এর আগে কখনো আসা হয়নি পটুয়াখালীতে। যদিও আমার নিজ জেলা ভোলা থেকে পটুখালী খুব বেশি দূরে নয়। রফিক ভায়ের লেখা চিরকুটটা আমার কাছে এখনো আছে। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে আল্পনা বা জয়িতাকে।