ছোটগল্প: থুতু

মাটি লেপ্টে বসে আছেন যিনি, তিনি আমার মা। মাকে আমরা আজই প্রথম এভাবে দেখালাম। অবশ্য তার আজকের বসার এই ভঙ্গিটি আমাদের বিশেষ পরিচিত। যাকে দেখে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম তিনি মনোরমা অথবা মনি পাগলী। আমাদের গ্রামের এক অতিপরিচিত নাম। আমাদের নিত্যদিনের আসা-যাওয়ার পথে মনোরমাকে দেখা যেত। এলোচুলে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডানা ঝাপটানো পাখির মতো বসে মাথার চুল ছিঁড়ে আঙুলে পেঁচাতেন, কিংবা তিনি হয়ত মাথায় চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে চোখের সামনে নিয়ে এসে উকুন মারার দৃশ্যায়ন রচনা করতেন। কথা খুব কম বলতেন তিনি, যতটা বলতেন তা অস্পষ্ট ও ক্ষীণগামী। হঠাৎ করেই বুক ফুলে জলোচ্ছ্বাসের মত করে কান্নার রোল নামতো তার। তখন বেশ কয়েকটি সুর পরস্পরের পিঠে ওঠানামা হত।

আমাদের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সরু আইলের মত রাস্তাটি ধরে কয়েক মিনিট হাঁটলেই একটি মধ্যমাপের রাস্তা সামনে পড়ে। এই রাস্তাটি ধরে আরও কিছু পথ এগুলে একটি তিন রাস্তার মোড়, যাকে আমরা তেমাথার মোর বলি। তেমাথার মোড়েই একটি স্বল্পদেহী বটগাছের তলে ছিল মনোরমার অস্থায়ী আস্তানা। গ্রামের মানুষ তাকে মনি পাগলী ডাকত। মাঝ বয়সী মনোরমার জরাজীর্ণ দেহের জায়গায় জায়গায় পুরাতন আব্রুর দুর্বলতায় চোখ এড়াত না। তার বসার ভঙ্গিটি ছিল শিশুদের মত দুই হাঁটু ভেঙে মাটি লেপ্টে। এভাবে বসার দরুন ঐ নেংটি মতন এক টুকরো কাপড় উঠে থাকতো উরুর কাছাকাছি।

বাবার হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে মা-ও বসে থাকেন এভাবে। তখন মায়ের সাথে মনোরমার যেন অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পেলাম। মনে হত তেমাথার মোড়ের মনোরমাই আমার মা। তাকে গিয়ে মা বলে ডাকি কিংবা আমার মাকে গিয়ে বলি মনি পাগলী। বাবার হাতে মায়ের মার খাওয়া পরিবারে একটি অভ্যস্ততার সীমায় পৌঁছে গেলেও মায়ের এই রূপ পরিণতি দেখলে মাথায় প্রচণ্ড ক্রোধ চেপে যেত। ক্রোধ চাপত ঐ বিশ্রী কদাকার বাবাটার ওপর। শিশুমনে রাজ্যশাসনের মতো বাবাকে খুনের নেশা জাগত ঐ মুহূর্তগুলোতে।

বাবা ছিলেন এক অকর্মণ্য পাষাণ ব্যর্থ বিবাগী মানুষ। আত্মনিমগ্নতা ছিল তার জাত ধর্ম। বজ্রমূর্তির মতো গায়ে গতরে দেখতে মানুষটার ভেতরেও ছিল না ন্যূনতম দয়া মায়ার বালাই। কারণে-অকারণে সীমাহীন যাতনা দিতেন আমাদের চার ভাইবোন ও মাকে। ছোটবেলায় লোকটাকে একটা দুঃস্বপ্নের পিশাচ বলেই ভাবতাম আমরা।

আমাদের সর্বকনিষ্ঠ দুই ভাইয়ের জন্মের আগে একটি কাগজ তৈরির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সরকারি ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি বৈরিতার রোষাণলে পড়ে কাগজ কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায় একসময়। তারপর থেকে বেকার তিনি। কখনো চেষ্টাও করেননি আরও একটি কাজ খুঁজে পেতে। অথচ চাকরি হারিয়ে লোকটি প্রচণ্ড মাত্রায় দিশেহারা ও হতাশ।

পাড়ার কিছু ছুটকো মাস্তানের পাল্লায় পড়ে একসময় নেশাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। কারখানায় কাজ চলাকালীন হয়ত কিছু টাকা সঞ্চয় ছিল, যা দিয়ে পরবর্তীতে মদের নেশা ও জুয়ার আসরে সচল থাকতেন তিনি। এদিকে ঘরে স্ত্রী-সন্তান মিলে পাঁচ সদস্য কীভাবে খেয়ে না খেয়ে দিনান্তর বেঁচে আছে তার খোঁজখবরই রাখতেন না।

আমরা যেটুকু সময় তাকে ঘরে পেতাম তিনি ঘোরগ্রস্ত পশুর মত ঘুমাতেন। সত্যি বলতে কি আমাদের সাথে তার নিয়মটি মিলত না। আমাদের ঘুমের ভেতর তিনি বাড়ি ফিরতেন, আমাদের জাগ্রত সময়ে নাক ডেকে ঘুমাতেন। বেলা করে উঠতেন ঘুম থেকে, যখন আমরা তার ভয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটু দূরে অবস্থান নিতাম। তিনি যথারীতি হাফ হাতা শার্টটি গায়ে জড়াতে জড়াতে বেড়িয়ে পড়তেন ঘর থেকে। আমরা জানতাম, তার ফিরে আসতে আসতে চার ভাইবোন নিদ্রায় ডুবে যাবো। একমাত্র আমাদের মা-ই জেগে থাকতেন তন্দ্রা অতন্দ্রায়। বাবা মাতাল হয়ে এসে দরজায় একটি কি দুটি টোকা দিতেই দরজা খুলে দাঁড়াতেন তিনি। কোনদিন যদি দরজাটি খুলতে সামান্য দেরি হত, সেদিন মধ্যরাতেই চলত বাবার বিভীষণ।

বাবার প্রসঙ্গটি এলেই মা বাবাকে ‘ভাদাইম্মা’ বলে গাল দিতেন। মায়ের মুখে এই ‘ভাদাইম্মা’ শব্দটি শুনে মনে হত এর অর্থও বুঝি বাবার মত কদাকার বিশ্রী। শব্দটির প্রকৃত অর্থ জানতাম না, মায়ের মুখভঙ্গি থেকে ভাবার্থ দাঁড় করাতাম। তারপর কখনো আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে সামান্য মনোমালিন্য হলে একজন আরেকজনকে ‘ভাদাইম্যা’ বলে গাল দিয়ে প্রতিশোধের ক্রোধ বায়বীয় করতাম।

 

 

আমাদের এই সংসারটি কীভাবে চলত, আমরা কেউই জানতাম না। সংসার বলতে আমাদের সদস্যদের অন্নসংস্থান। একবেলা কোনোরকমে নুনপান্তা খাই কি টানা দুতিন বেলা উপোষ। উপোষ থেকে থেকে একসময় আর নিজের পেটের বেদনা সহ্য করতে পারতাম না। দুঃসহ লাগত সবকিছু। তখন দলবেঁধে আমরা মায়ের পাশে পাশে ঘুরঘুর করতাম। প্রথমে নীরবে মৌন নিবেদন তারপর একটু একটু করে পেটের প্রতিবাদ চলে আসত মুখের ভাষায়। ক্লান্ত, বিবর্ণ, চিন্তিত মায়ের পাশে আমরা পিঠাপিঠি চার ভাইবোন মিলে অন্ন প্রার্থনায় নামতাম। আমাদের এই সঙ্কট বহুদিনের। ক্ষুধা নিবারণ করে বাবার মত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি এমন স্মৃতি আমাদের জীবনে খুব কমই এসেছে। প্রথম প্রথম মা আমাদের শান্ত করতে কোনরকমে প্রতিশ্রুতি দিতেন। খাবারের ব্যবস্থা করা হবে বলে আশান্বিত করতেন। কিন্তু তার প্রতিশ্রুতির প্রতি আমাদের অনাস্থা ধরতে সময় লাগে না। তখন আমরা ক্রমেই আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতাম।

 

 

আমরা স্বপ্ন দেখি খাদ্যপ্রাপ্তির। মা কীভাবে কীভাবে যেন খাবারের ব্যবস্থা করে ফেলতেন। তবে প্রতিবারে যে তিনি সফল হন তাও-না। বাড়ি ফিরে তার হাত খালি দেখলেই যেন আমাদের ক্ষুধার প্রকোপ বেড়ে যায়। আমরা তাকে ত্যক্ত করতে শুরু করে দেই। আর ক্রমেই তিনি অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেন। ততক্ষণে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে হাতের কাছে যা পেতেন ছুঁড়ে মারতেন আমাদের লক্ষ্য করে। কখনো তার হাতের পাঁচ আঙুল বসে যেত আমাদের গালে অথবা পিঠে। এরপর আমাদের মরণ দান নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন স্রষ্টার দরবারে।

 

 

আমাদের ক্ষুধা বিবাদজনিত হৈচৈ-এর শব্দে মাঝে মাঝে বাবার ঘুম ভেঙে যেত। তিনি বিছানা থেকে উঠে এসে মায়ের চুলের গুছি ধরে তাকে ইচ্ছেমত আছড়াতেন। আমরা চার ভাইবোন বাবার এই রুদ্রমূর্তি দেখে প্রচণ্ড ভয়ে দৌড়ে পালাতাম তার ত্রিসীমানার বাইরে। আমাদের হৃৎপিণ্ডগুলোতে তখন যেন একই ছন্দ পড়ে যেত। কখনো বৃষ্টি, কখনো গির্জার ঘণ্টা। আমি যেন আমার ইমেডিয়েট বড় ভাই ছুটুর, ছুটু যেন আমাদের একমাত্র বোন লিলি, লিলি যেন বুলুর হৃৎপিণ্ডের কম্পন টের পেতাম। আমরা তখন আমাদের এই মানবজন্মকে ঘৃণিত ও অভিশপ্ত ভাবতাম।

 

 

বাবা মাকে ইচ্ছেমত পিটিয়ে সাপের মত ফোঁসফোঁস করে করে ছুটে আসতেন ঘরে। তারপর তার সেই যে ঐতিহাসিক মলিন, ছেরাফাটা চিটচিটে জামাটি টেনে নিয়ে গায়ে জড়াতে জড়াতে আবার ছুটতেন। আমরা জানতাম, তিনি এই যাত্রায় ফিরে আসবেন একেবারে গভীর রাতে। মাতাল অচেনা এক অন্য মানুষ হয়ে।

এভাবেই আমাদের দিনগুলো চলত, একই নিয়মে। কিন্তু একদিন ঘটনাটি অন্যরকম ঘটল।

মনে পড়ে সেদিন বৈশাখের এক ভ্যাপসা গরমের দিন। চারদিকে প্রতিদিনের অস্থির প্রকৃতি যেন নীরব হয়ে উঠল ভীষণ উত্তপ্ত বায়ুতে। আজ যেন সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার আয়োজন চলছে। বাবা মাকে পিটিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে বেড়িয়ে গেলেন ঘর থেকে। মায়ের শরীর রক্তাক্ত, ছোপ ছোপ রক্ত। ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরছিল, কপাল ফুলে মাটির বড় টিলার আকৃতি। আমরা স্বভাবত তার কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করি। তাকে চরম উত্তেজিত দেখাচ্ছিল তখন। তিনি ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে এক দলা থুতু ফেললেন মাটিতে। যেন তার এই নিঃসৃত থুতুগুলো আমাদের দিকে ছুড়ে ফেলা ক্রোধের বিষ। আমরা তার থুতুর দিকে তাকিয়ে থাকি। মা ক্রুদ্ধচিত্তে আমাদের চরম অবহেলা করে হনহন করে ছুটে যান ঘরের দিকে। মায়ের আচরণ আমাদের মধ্যে এক থমথমে আবহ গেঁথে যায়। আমরা কিছু জানতে ও বুঝতে পারছি না। মাকে আগে কখনো এভাবে হেঁটে যেতে দেখিনি।

 

 

আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বুদ্ধিমান লিলি কিছু একটা ভেবে মায়ের পিছুপিছু ঘরের দিকে হেঁটে যায়। আমরা ভীতসন্তস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি বাইরে। তারপর হঠাৎ লিলির চিৎকার শুনে আমরাও দৌড়ে এগোই সেদিকে।

লিলিসহ চার ভাইবোন মিলে মায়ের পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকি। ভীষণ কান্না পাচ্ছিল আমাদের তখন। মাও আমাদের সাথে কাঁদছিলেন।

আমাদের মা, তিনি আত্মহত্যা করতে গিয়ে এক মুঠো বিষাক্ত গম মুখে পুরে দিয়েছেন- যে গম ইঁদুর মারার টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তারপর আমাদের চিৎকার, হাহাকার, উদ্বিগ্নতা দেখে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। কিছুক্ষণ বাক্যহারা ও দিশেহারা অবস্থার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলেন। তারপর হঠাৎ মুখের ভেতরের গমগুলো গলায় চালান না করে সশব্দে মুখ থেকে থুতুযোগে ছুড়ে ফেলে দেন আমাদের দিকে।

 

 

আমাদের সামনে তার মুখনিঃসৃত ভালোবাসার থুতু। আমরা পাঁচ ভাইবোন মিলে বিষাক্ত গমের থুতুগুলোর দিকে তাকিয়ে অন্য এক অর্থ তর্জমা করতে থাকি।