রহস্যই রয়ে গেল মাহফুজার স্বীকারোক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক: গর্ভধারিণী ‘মা’ নিজেই স্বীকারোক্তি দিলেন। শুনে সকলেই অবিশ্বাস্য মনে করছেন। কিন্তু না! সেই ‘মা’ নিজেই স্বীকারোক্তি দিলেন। গর্ভেধারণ করা তার জীবনের চেয়েও আদরের দুই সন্তানকে নিজ হাতেই খুন করেছেন।শুধু তাই নয়, নিজ হাতে খুনের পর থেকেই বলে আসছেন, তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন তিনি। আর এ কারণেই হঠাৎ করেই সন্তানদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তার মেয়ের কাছে থাকা ওড়না দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। মেয়েকে হত্যার পর ঠিক একইভাবে তার ঘুমন্ত শিশু ছেলেকেও হত্যা করেন। গর্ভধারিণী মায়ের এই স্বীকারোক্তি র‌্যাব ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারাও বিশ্বাস করতে চাননি। র‌্যাবের কর্মকর্তাগণ প্রথমে সবাই বিস্মিত হন। কিভাবে এ কাজ করা সম্ভব! তাই নেপথ্য অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা ছিল তাদের। র‌্যাবের চৌকস কর্মকর্তাগণ রাতভর জোর প্রচেষ্টা চালায়। নানা কৌশলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের চৌকস কর্মকর্তাগণ নানা কৌশলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, কিন্তু না! দুই শিশুর গর্ভধারিণী ‘মা’ একই স্বীকারোক্তি দিলেন।

গোয়েন্দা পুলিশের এক সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি নিজেই আফসোস করে বলেছেন, সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা উপশমের জন্য যদি মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেন। তাহলে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন না তিনি। আর এই দুই সন্তানকে হত্যার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু রহস্য রয়েই গেল। শুধু তদন্ত কর্মকর্তাগণই নয়, সকল মহলেই অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কি মা তার সন্তানদের মেরে ফেলতে পারেন?

রাজধানীর রামপুরা এলাকার বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার একটি বাসা থেকে গত সোমবার দুই ভাইবোনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়। এরপর রাত ৮টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিহত দুই শিশুর মধ্যে ১৪ বছর  বয়সী নুসরাত আমান অরণী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইস্কাটন শাখার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। আর তার ছোটভাই আলভী আমান (৬) হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারিতে পড়তো। তাদের বাবা আমানুল্লাহ একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। আর তাদের গর্ভধারিণী ও হত্যার দায়ে গ্রেফতারকৃত মায়ের নাম মাহফুজা মালেক জেসমিন। স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে প্রথমে শিক্ষকতা করলেও পরে সাধারণ গৃহিণী ছিলেন। তিনি আটকের পর দুপুরে সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলে ছিলেন, গর্ভধারিণী ‘মা’ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘দুশ্চিন্তার একপর্যায়ে’ নিজের ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে ছেলে-মেয়েকে হত্যা করেন তিনি। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে পরিকল্পিতভাবে সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু হত্যার পর নিজে বাঁচতে চাইনিজ খাবার খেয়ে বিষক্রিয়ায় তারা মারা যায় বলে তিনি প্রচার করেন।

‘গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি মেয়ে অরণী যখন গৃহ শিক্ষকের কাছে পড়ছিল, তার মা ও ভাই তখন শোবার ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। গৃহ শিক্ষক চলে যাওয়ার পর মাহফুজা তার মেয়েকেও ঘুমাতে ডাকেন। অরণী বিছানায় যাওয়ার পর মাহফুজা তার ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে মেয়েকে শ্বাসরোধ করেন। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে মেয়ে বিছানা থেকে পড়ে যায়। এরপর মেয়ের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি একইভাবে তার ছেলেকেও ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করে।’ ‘হত্যাকাণ্ডের পর প্রথমে সে ঘটনা গোপন করার জন্য স্বামীকে ফোন করে ছেলেমেয়ের অসুস্থতার কথা বলে। আমানুল্লাহ তখন দুই বন্ধুকে বাসায় পাঠায়। বাচ্চাদের হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় র‌্যাব কর্মকর্তারা প্রথমে জানান, ঘটনার পর পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তাদের মনে হয়েছে এই হত্যাকা-ের সঙ্গে পরিবারের লোকজন জড়িত থাকতে পারে। ফলে ঘটনার পরপরই র‌্যাব বাসার দারোয়ান, দুই গৃহ শিক্ষক ও দুই আত্মীয়কে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বনশ্রীর বাসায় অবস্থানকারী অরণী ও আলভীর দাদি র‌্যাব কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তিনি বিকেলে অরণীর গৃহ শিক্ষক চলে যাওয়ার পর ঘর থেকে কারো কান্নার শব্দ পান। এ সময় তিনি জেসমিনের ঘরের দরজা বন্ধ পান। কয়েক মিনিট পরে জেসমিন তাকে দুই সন্তান আর পৃথিবীতে নেই বলে জানায়।

গর্ভধারিণী ‘মা’ জেসমিনের স্বীকারোক্তি : দুই শিশু সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে বলে ঢামেক মর্গের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের ধারণার পর পরই তাদরে নিকটাত্মীয়দের সন্দেহ হয়। আর ঘটনার পরদিন বাবা-মা ও খালা হাসপাতালের মর্গে না গিয়ে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় সন্দেহ আরো বৃদ্ধি পায়।

পরে র‌্যাব-৩ এর একটি দল নিকটাত্মীয়দের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জামালপুর থেকে নিহত দুই শিশুর বাবা আমানউল্লাহ, মা মাহফুজা মালেক জেসমিন, খালা আফরোজা মালেক নীলাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। এরপর র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে নিহত দুই শিশুর মা আগের অবস্থানে অনড় থাকেন। তবে বারবার বিভিন্ন কায়দায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে রাত ৯টার দিকে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাদের কাছে কীভাবে এবং কেন দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন, তা খুলে বলেন তিনি।

দুই শিশু হত্যার বিবরণ শুনে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাগণ রীতিমতো চমকে ওঠেন এবং তারা সবাই বিস্মিত হন। তার দেয়া তথ্য বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় প্রকৃত কারণ জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু না সেই একই কথা! ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তার কারণেই হত্যা করেছেন বলে তাদেরকে জানান। মায়ের এই স্বীকারোক্তি শুনে ‘থ’ বনে যান দুই শিশুর বাবা আমানউল্লাহ।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, শিশুদের মায়ের মুখে স্বীকারোক্তি শুনে আমরাই বিস্মিত হয়েছি। এখন এর নেপথ্যে আর কোনো কাহিনী আছে কিনা তা তদন্ত কর্মকর্তা খুঁজে বের করতে পারবেন। কিন্তু না! রামপুরা থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাগণও নতুন কোনো তথ্য উদ্ধার করতে পারেননি। জেসমিন আক্তার ঠিক একই বক্তব্য দিয়েছেন। নিজ হাতেই গলা টিপে হত্যা করেছেন বলে আদালতে একই স্বীকারোক্তি দিলেন।

বনশ্রীর আলোচিত দুই ভাইবোন হত্যা মামলার একমাত্র আসামি মা মাহফুজা মালেক জেসমিন আজ রোববার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঢাকার মহানগর হাকিম গোলাম নবী তাঁর খাসকামরায় মাহফুজার জবানবন্দি নেয়া হয়। আজ মাহফুজার পাঁচ দিনের রিমান্ডের শেষদিন ছিল। কিন্তু রিমান্ডের চতুর্থ দিনেও তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের সন্তোষজনক কারণ উদ্ধার করতে পারা যায়নি। শনিবার সন্ধ্যায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক লোকমান হেকিম জানিয়েছিলেন। রিমান্ডে মাহফুজা আগের মতোই দুই সন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তিনি হত্যার কারণ হিসেবে তাদের পড়ালেখা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা উল্লেখ করেছেন।

উল্লেখ্য, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বনশ্রীর বি-ব্লকের একটি বাসায় মাহফুজা মালেকের দুই সন্তান নুসরাত আমান (১২) ও আলভী আমানের (৬) মৃত্যু হয়। মত্যুর পর স্বজনেরা বলেন, চায়নিজ রেস্তোরাঁর খাবার খেয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। পরদিন ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত পাওয়া যায়। এরপর ৩ মার্চ র‌্যাব দাবি করে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মাহফুজা মালেক সন্তান হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। ওই দিন রাতেই মাহফুজাকে একমাত্র আসামি করে দুই সন্তানের বাবা আমান উল্লাহ রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। রামপুরা থানার পুলিশ তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়। রিমান্ডে পুলিশ সন্তোষজনক তথ্য না পাওয়ায় ৯ মার্চ আলোচিত মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়।